মাদ্রাসায় অনৈতিক কর্মকাণ্ড রোধে কঠোর উদ্যোগের আহ্বান শায়খ আহমাদুল্লাহর
দেশের আবাসিক মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্ট ইসলামি বক্তা ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশু নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ সামনে আসার প্রেক্ষাপটে তিনি এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মতামত দেন এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব তুলে ধরেন।
শনিবার (২৩ মে) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, আবাসিক মাদ্রাসাগুলোতে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো বন্ধ করতে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, এ বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরেই তিনি উদ্বিগ্ন এবং অতীতেও বিভিন্ন সময়ে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করেছেন।
শায়খ আহমাদুল্লাহ বর্তমানে হজ সফরে অবস্থান করছেন বলেও পোস্টে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, সফরে থাকায় বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার সুযোগ এখনই নেই। তবে দেশে ফিরে তিনি এ বিষয়ে আরও বিস্তৃতভাবে কাজ করবেন এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তাবনা উপস্থাপন করবেন।
$ads={1}
পরে পোস্টের মন্তব্য অংশে তিনি সাম্প্রতিক আলোচিত কয়েকটি ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তিনি বলেন, রাজধানীর মিরপুরে শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাটি যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল, তখন তিনি হজের উদ্দেশে ঢাকা বিমানবন্দরে ছিলেন। সেখান থেকেই তিনি একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন।
তিনি আরও জানান, বনশ্রীর একটি মাদ্রাসায় আরেকটি অভিযোগের খবর ছড়িয়ে পড়ার সময় তিনি বিমানে ছিলেন এবং নেটওয়ার্কের বাইরে থাকায় বিস্তারিত জানতে পারেননি। পরে সৌদি আরবে পৌঁছে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হলেও উমরাহ ও অন্যান্য ধর্মীয় ব্যস্ততার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য করা সম্ভব হয়নি।
তবে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, অপরাধী মাদ্রাসার ভেতরের হোক কিংবা বাইরের—যে-ই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, অপরাধকে প্রশ্রয় দিলে বা চেপে রাখলে সমাজে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
শায়খ আহমাদুল্লাহর ভাষ্য অনুযায়ী, আবাসিক মাদ্রাসাগুলোতে কিছু বিচ্ছিন্ন যৌন অনাচারের ঘটনা ঘটে থাকে, যা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি এটিও দাবি করেন, অনেক সময় গণমাধ্যমে ঘটনাগুলো অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করা হয় কিংবা প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে বিভ্রান্তিকর তথ্যও যুক্ত হয়।
তিনি বলেন, কোথাও কোথাও প্রকৃত অপরাধীকে আড়াল করতে দুর্বল বা সাধারণ কোনো ইমাম কিংবা আলেমকে ফাঁসানোর ঘটনাও ঘটে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ফেনীর একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। সেখানে এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে স্থানীয় এক ইমামকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। পরে ফরেনসিক পরীক্ষায় দেখা যায়, ওই সন্তানের ডিএনএ অভিযুক্ত ইমামের সঙ্গে নয়, বরং কিশোরীর বড় ভাইয়ের সঙ্গে মিলে যায়। এরপর ইমাম নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে মুক্তি পান।
এ কারণে তিনি মনে করেন, যেকোনো অভিযোগের সঠিক তদন্ত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। শুধুমাত্র সামাজিক চাপে কাউকে দোষী বা নির্দোষ বলা উচিত নয়। বরং তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করে আইনের আওতায় বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
$ads={2}
শায়খ আহমাদুল্লাহ জানান, তিনি এর আগেও ২০১৯ সালে এ বিষয়ে কিছু বাস্তবধর্মী পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তি ও সুশাসনের সমন্বয় জরুরি।
তিনি যেসব প্রস্তাব দিয়েছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো—মাদ্রাসার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কক্ষ সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা। এতে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হবে এবং অপরাধ প্রবণতাও কমে আসবে।
এছাড়া শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তাঁর মতে, শুধু ধর্মীয় শিক্ষা দিলেই হবে না; শিক্ষকদের নৈতিকতা, আচরণ ও শিশু মনোবিজ্ঞান সম্পর্কেও প্রশিক্ষিত হতে হবে। একজন শিক্ষক যেন শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারেন, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষকদের জন্য আলাদা পারিবারিক বাসস্থানের ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। কারণ অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন পরিবার থেকে দূরে থাকার কারণে মানসিক ও সামাজিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি শিক্ষকদের নিয়মিত ছুটির ব্যবস্থাও নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবে তিনি বলেন, শ্রেণিকক্ষ ও আবাসন ব্যবস্থা আলাদা রাখা প্রয়োজন। একই জায়গায় ক্লাস ও আবাসনের কারণে পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে আলাদা মনিটরিং ব্যবস্থা থাকা উচিত।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য ঢালাওভাবে মেঝেতে ঘুমানোর ব্যবস্থা পরিবর্তন করে পৃথক খাট বা নির্দিষ্ট বেডের ব্যবস্থা করা উচিত। এতে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
$ads={1}
মহিলা মাদ্রাসাগুলোতে পুরুষ শিক্ষক বা কর্মচারী নিয়োগ না দেওয়ার বিষয়েও মত দেন তিনি। তাঁর মতে, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও মানসিক স্বস্তির জন্য এটি কার্যকর হতে পারে।
শায়খ আহমাদুল্লাহ আরও দাবি করেন, বড় ও সুসংগঠিত মাদ্রাসাগুলোতে এ ধরনের অভিযোগ তুলনামূলক কম শোনা যায়। বরং নিয়ন্ত্রণহীনভাবে গড়ে ওঠা ছোট ছোট আবাসিক মাদ্রাসাগুলোতেই বেশিরভাগ অভিযোগ সামনে আসে। তাই এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
তিনি প্রস্তাব দেন, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়ার সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আলেম, মনোবিজ্ঞানী, আইন বিশেষজ্ঞ এবং শিশু অধিকারকর্মীদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা যেতে পারে।
এই কমিশনের কাজ হবে—যেকোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে সরেজমিন তদন্ত করা, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেওয়া। যদি অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন তিনি আর কোনো মাদ্রাসায় চাকরি নিতে না পারেন, সে জন্য তাঁকে ব্ল্যাকলিস্ট করার ব্যবস্থাও রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
অন্যদিকে অভিযোগ মিথ্যা বা ষড়যন্ত্রমূলক হলে সেটিও জনসম্মুখে তুলে ধরা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। এতে নিরপরাধ ব্যক্তির সম্মান রক্ষা পাবে এবং মানুষ প্রকৃত সত্য জানতে পারবে।
শায়খ আহমাদুল্লাহর মতে, এ ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে একদিকে যেমন অপরাধ কমে আসবে, অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে মানুষের আস্থাও বাড়বে। বর্তমানে মাদ্রাসাগুলোর ভাবমূর্তি নিয়ে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
$ads={2}
তিনি মনে করেন, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সমাজে নৈতিকতা ও আদর্শ গঠনের জায়গা। তাই সেখানে কোনো ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠলে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করে না, বরং পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সবশেষে তিনি সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ একটি নিরাপদ শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়, বরং পুরো সমাজের দায়িত্ব।
