আশুলিয়ায় ছয় লাশ পোড়ানোর মামলায় সাবেক এমপি সাইফুলকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

 



$ads={1}

জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে ঢাকার আশুলিয়ায় ছয়জনের মরদেহ পোড়ানোসহ মোট সাতজনকে হত্যার বর্বরোচিত ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। রায়ে আদালত কেবল দণ্ডাদেশই দেননি, বরং দণ্ডিত সাবেক এমপির সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে সমানভাবে বণ্টন করে দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের অপরাধের ঘটনায় এটি তৃতীয় রায় হিসেবে চিহ্নিত হলো।


বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন এই ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারপতি নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। গত ১ ফেব্রুয়ারি উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আজকের দিনটিকে রায় ঘোষণার জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছিল। এর আগে গত বছরের ২১ আগস্ট ১৬ জন আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে এই চাঞ্চল্যকর মামলার বিচার কাজ শুরু হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে রাষ্ট্রপক্ষে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম এবং আসামিপক্ষে অ্যাডভোকেট সৈয়দ মিজানুর রহমান ও এসএম মিরাজুল আলম আজমান তাদের সমাপনী যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। গত ২০ জানুয়ারি যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর আদালত মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ বা সিএভি হিসেবে রেখেছিলেন।


চাঞ্চল্যকর এই মামলার ১৬ জন আসামির মধ্যে সাবেক এমপি সাইফুল ইসলামসহ মোট আটজন এখনও পলাতক রয়েছেন। অন্যদিকে, ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আব্দুল্লাহিল কাফী, সাবেক অতিরিক্ত সুপার (সাভার সার্কেল) মো. শাহিদুল ইসলাম এবং পরিদর্শক মো. আরাফাত হোসেনসহ মোট আটজন বর্তমানে কারাগারে আছেন। মামলার বিচার চলাকালীন এসআই শেখ আবজালুল হক আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন জানালে আদালত তা গ্রহণ করেন। রাজসাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য প্রদান করায় বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তাঁকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

$ads={1}

মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আশুলিয়ায় আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যার পর ছয়জনের মরদেহ একটি ভ্যানে স্তূপ করা হয় এবং পরে তাতে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এই অমানবিক ও নৃশংস ঘটনার ভিডিও চিত্র দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি হয়। তদন্তে উঠে আসে যে, এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পেছনে তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও পুলিশের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের সরাসরি যোগসাজশ ও নির্দেশনা ছিল। আদালত পর্যবেক্ষণে এই ঘটনাকে ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কজনক ও জঘন্যতম অপরাধ হিসেবে অভিহিত করে প্রধান আসামীকে সর্বোচ্চ দণ্ড প্রদানের সিদ্ধান্ত নেন।


রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষ সন্তোষ প্রকাশ করে জানিয়েছে, এই দণ্ডাদেশের মাধ্যমে জুলাই হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া পরিবারগুলো ন্যায়বিচার পেয়েছে এবং এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দণ্ড কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এদিকে, সাবেক এমপির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিগ্রস্তদের হস্তান্তরের বিষয়টি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর আর্থিক ও সামাজিক ক্ষত কিছুটা হলেও লাঘব করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আজকের এই রায়ের মাধ্যমে বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান এবং অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার প্রক্রিয়ায় ট্রাইব্যুনাল আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।

Post a Comment

Previous Post Next Post